চুলপড়া টাক সমস্যার সমাধান নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ ও চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনা Baldness problem

কারো কারাে মাথার চুল ক্রমশ পড়ে যায় এবং টাক জেগে ওঠে, বিশেষ করে মাথার সামনের দিকে টাক পড়তে শুরু করে। এ অবস্থায় চুলপড়া রােধ কল্পে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে?

বংশগত কারণে চুল ঝরে গেলে সেক্ষেত্রে তেমন কিছু করার থাকে না। তবে মাথায় খুশকি থাকলে কিংবা অন্য কারণে চুল পড়ে গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এক্ষেত্রে নিজোরাল শ্যাম্পু সপ্তাহে ২/৩ বার ব্যবহার করা যেতে পারে। আর চর্ম বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে কি কারণে চুল পড়ছে? এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গােলাকার হয়ে চুল পড়া সমস্যা

অনেকের মাথার চুল মাঝে মাঝে পড়ে গিয়ে চামড়া বের হয়ে যায়। এর প্রতিকার কী?

চুল পড়ে যদি মাথায় গােলাকার টাক হয় তবে সমস্যাটির নাম ‘এ্যালােপেসিয়া এরিয়েটা'। এক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থানে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিতে হয়। একজন চর্মরােগ বিশেষজ্ঞই সে ব্যবস্থা নিবেন। আর যদি সমস্ত মাথা থেকে চুল ঝরে গিয়ে টাক পড়ে তবে সেটা ডিফিউজ এ্যালােপেসিয়া'। এক্ষেত্রে অনেক কারণের মধ্যে খুশকি একটি অন্যতম কারণ। এন্টিড্যানড্রাফ বা খুশকি বিরােধী শ্যাম্পু দিয়ে (যেমন-পলিটার, সেলসান ব্লু) সপ্তাহে ১-২ বার মাথা ধুলে উপকার পাওয়া যায়।

চুল কামানাে ও শেভ করা

অনেকে মনে করেন বার বার চুল কামালে বা শেভ করলে চুল ঘন ও কালাে হয়। এ ধারণাটি কতটুকু ঠিক?

এ ধারণাটি মােটেও ঠিক নয়। বার বার চুল কামালে বা শেভ করলে চুল ঘন ও কালাে কোনােটাই হয় না। চুল ঘন ও কালাে হওয়ার ব্যাপারটি অনেকটাই বংশগত।

গরম পানি দিয়ে গােসল করলে কি চুল পাকে?

কারাে কারাে ধারণা গরম পানি দিয়ে গােসল করলে নাকি মাথার চুল পেকে যায়। কথাটি কতটুকু সত্যি?

চুল পাকার কারণ অনেক। তবে গরম পানি দিয়ে গােসল করলে চুল পাকে এরকম কোন তথ্য প্রমাণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে নেই। কাজেই এটা সত্যি নয় বলে ধরে নেয়া যায়।

দৈনিক কয়টি চুল পড়তে পারে?

অনেকেরই প্রতিদিন ১৫-২০টি করে মাথার চুল ঝরে যায়। এর প্রতিকার কী?

মাথার প্রতিটি চুলের একটি নির্দিষ্ট স্থায়ীত্বকাল আছে। নির্দিষ্ট সময়ের পর যে চুলটি ঝরে যাওয়ার তা যাবেই এবং সেই স্থানে নতুন চুল গজাবে। স্বাভাবিকভাবে এই ঝরে যাওয়া চুলের পরিমাণ হচ্ছে দৈনিক ১০০ টি। যদি কোন কারণে ১০০ টির বেশি চুল ঝরতে থাকে, তবেই মাথায় টাক দেখা দেয় এবং তখন চিকিৎসার প্রয়ােজন হয়। তাই প্রতিদিন ১৫-২০টি করে মাথার চুল ঝরে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এর জন্যে চিকিৎসার প্রয়ােজন নেই। বন্ধু সাবধান! এখনও যাদের টাক পড়েনি দিন দিন মাথার চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ ঝরে যাচ্ছে বা টাক পড়ে যাচ্ছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। চুল ঝরে যাওয়া বা টাক পড়া দুইভাবে হয়ে থাকে।

Diffuse Alopecia অর্থাৎ পুরাে মাথার চুল এমনভাবে ঝরে যাচ্ছে যে, মাথার তালু বা চামড়া অতি সহজেই দেখা যায়।

Patchy Alopecia অর্থাৎ মাথার কিছু কিছু অংশে গােল গােল আকারে চুল পড়ে যাওয়া। টাক পড়া সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার আগে চুলের বিভিন্ন পর্যায় বা Stage সম্পর্কে কিছু জানা প্রয়ােজন।

গজানো থেকে শুরু করে ঝরে যাওয়া পর্যন্ত চুল তিনটি পর্যায় পার হয়।

Anagen stage বা চুল গজানাের পর্যায়- এই ধাপটি দেখা যায় না। এ সময়ে ত্বকের ভিতরে গােড়া থেকে চুল গজাতে থাকে। এতে সময় লাগে প্রায় ৩-১০ বছর।

Catagen stage বা চুল পরিপক্কতা লাভের ধাপ-চুল গজানাে শেষ হয়ে পরিপক্কতা লাভ করতে চুলের সময় লাগে ২-৩ সপ্তাহ।

Telogen stage বা চুল ঝরে যাওয়ার ধাপ-এ অবস্থার শেষে (৩-৪ মাস) চুল আপনা আপনি ঝরে যায় এবং এটাই স্বাভাবিক। নতুন চুল আবার গােড়া থেকে গজিয়ে শূন্য জায়গা পূরণ করে নেয়। মাথার চুলের আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। এর মধ্যে ৭০-১০০টি চুল প্রতিদিন ঝরে যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন ১০০ টি চুল প্রতিদিন ঝরে যায়। কাজেই প্রতিদিন ১০০ টি চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু যখন এই ১০০ টির বেশি চুল পড়ে, তখনই মাথার তালু খালি হয়ে যেতে থাকে।

সার্বিকভাবে পুরাে মাথার চুল যেসব কারণে ঝরতে পারে।

Traction- প্রচলিত একটি ধারণা আছে যে রাতে শােবার আগে টান টান করে বেণী বেঁধে ঘুমালে চুল তাড়াতাড়ি লম্বা হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। চুল কতটুকু লম্বা হবে তা নির্ভর করে জেনেটিক, হরমােন ও পুষ্টির ওপর। বরঞ্চ উল্টো ক্ষতিই হয়ে থাকে। যে চুলগুলাে আরও কিছুদিন মাথায় থেকে তারপর ঝরে যাওয়ার কথা, তা পূর্বেই ঝরে যায় অতিরিক্ত টান লাগার কারণে।

Postpartum বা প্রসব পরবর্তী-বাচ্চা প্রসবের ২-৫ মাস পর হঠাৎ চুল ঝরে যেতে থাকে। মাথা প্রায় খালিই হয়ে যায়। প্রায় ২-৬ মাস ধরে এ প্রয়া চলতে থাকে। তবে আশার বিষয় যে এ চুল আবার সম্পূর্ণ গজিয়ে থাকে।

Postnatal বা নবজাত অবস্থায়— নবজাতকের মাথার চুল জন্মের পর থেকে ৪ মাসের ভিতর অনেকটাই ঝরে যায়। এতে মা-বাবা ভয় পেয়ে যান এবং ভাবেন বাচ্চার মাথার চুল কি কম হবে ! না, এতে ঘাবড়ানাের কিছু নেই। ছয় মাস বয়সের সময় আবার চুল গজিয়ে যাবে। কখনও কখনও পুষ্টিহীনতার কারণে চুল গজাতে একটু দেরি হতে পারে।

Post febrile বা জ্বরের পর— কঠিন কোন জ্বর, যেমন নিউমােনিয়া, টাইফয়েড হওয়ার ২-৪ মাস পর হঠাৎ চুল ঝরতে শুরু করে এবং প্রায় পাতলা হয়ে যায়। কিন্তু কিছুদিন পর এ চুল আবার গজিয়ে থাকে।

Psychogenic বা মানসিক কারণ— মানসিক রােগ বা দুশ্চিন্তা বেশি করলে চুল পড়ে যায়। দুশ্চিন্তা যদি বেশি দিন থাকে তবে চুল কয়েক দফায় (repeated) ঝরতে পারে।

Drug বা ওষুধ— কিছু কিছু ওষুধ সেবনে চুল পড়ে যেতে পারে, যেমন ইনডােমেথাসিন (ব্যথার ওষুধ) জেনটামাইসিন (এন্টিবায়েটিক), প্রপ্রানােলল (ব্লাড প্রেসারে ওষুধ) ইত্যাদি। এসব ওষুধে সেই চুলগুলােই ঝরে যায় যেগুলাে হয়ত আর ক'দিন পরেই ঝরে যেত। কিন্তু কিছু কিছু ওষুধ, যেমন- ক্যানসারের ওষুধ, যে চুলগুলাে মাত্র গজাচ্ছে, সেগুলােকেও ঝরিয়ে দেয়।

Starvation বা অনাহার— ওজন বা মেদ কমানাের জন্য অনেকে হঠাৎ খাওয়া দাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেয়। এই হঠাৎ খাওয়া কমানাে চুল পড়ার কারণ হতে পারে, যেমনটি হয় অপুষ্টিজনিত কারণে।

Androgen hormore বা পুরুষ হরমােন— এর প্রভাবে ২০-৩০ বয়সের পুরুষদের কপালের দুই দিক এবং মাথার মধ্য অংশে টাক পড়ে। যাকে বংশগত টাকও বলা হয়। যদিও এ বিষয়ে বিতর্ক আছে। মহিলাদের ক্ষেত্রে -৪৫ বছর বয়সে মাসিক বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীরে পুরুষ হরমােনের (Androgen) আধিক্য হয় ও একই রকম টাক পড়তে পারে।

প্যাচি অ্যালােপেসিয়া বা মাথার কিছু অংশে গােলাকার হয়ে চুল পড়ার কারণ—

অনেক চর্মরােগে এ জাতীয় গােলাকার টাক দেখা দেয়। তবে তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে Alopecia Areate- এ অবস্থায় রােগী কোন একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে যে মাথার কিছু কিছু অংশে গােলকার টাক পড়েছে। আক্রান্ত স্থানের ত্বক মসৃণ, কোন চুলকানি বা লাল ভাব নেই। কোন খােসাও নেই। প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে, তেলাপােকা চুল খেয়ে ফেলেছে। না, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এ অবস্থা বেড়ে গিয়ে সম্পূর্ণ মাথার, এমনকি সমস্ত শরীরের পশমও ঝরে যেতে পারে। তবে যাই হােক এটি নিজে থেকেই ভাল হয়ে যায় (কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। আক্রান্ত স্থানে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে আকারে বেড়ে যাওয়াটাকে রােধ করা যায় এবং নতুন চুল গজাতেও থাকে। তবে এটি আবারও হতে পারে। এ জাতীয় সমস্যা যে কোন বয়সেই হতে পারে।

Tenia Capitis ফাংগাস বা ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হলে মাথায় গােল গােল টাক পড়ে। এন্টিফাংগাল খেলে ভাল হয়ে যায়। এটি সাধারণত স্কুলে যায় এমন বয়সের ছেলে-মেয়েদের হয়ে থাকে। আক্রান্ত স্থানের ত্বকে খােসা থাকে, কখনও কখনও শুধু কালাে কালাে চুলের গােড়া দেখা যায়, আবার কখনও পুঁজভাবে দেখা দেয়।

শেষ কথা

এতসব কারণের মধ্যে পাঠকবৃন্দের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত মতামত রেখে শেষ করতে চাই। আর তা হচ্ছে যে মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে “খুশকি”। মাথা চুলকালে গুড়া গুড়া খােসা দেখা যাওয়াটাকে খুশকি বলে। তবে কখনও কখনও খােসা দেখা যায় না, মাথায় শুধু তেলতেলে ভাব থাকে। এই খুশকিকে যদি দমিয়ে রাখা যায় তবে মাথায় যে চুল আছে তাকে হয়ত আরও ১০/২০ বছর টিকিয়ে রাখা যাবে। তবে একটি বিষয় জেনে রাখা ভাল যে খুশকি বা তেলতেলে ভাব (সেবােরিয়া) বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হরমােন (এনড্রোজেন) -এর প্রভাবে হয়ে থাকে। সুতরাং এমতাবস্থায় খুশকিকে দমিয়ে রাখা সম্ভব। আর খুশকি হবে না, এটা বলা সম্ভব নয়, যেহেতু এনড্রোজেন হরমােন কমানাে উচিত নয়। ডায়াবেটিস ভাল হয় না এই ভেবে কেউ এটাকে কন্ট্রোল না করলে সে মারা যাবে। ব্লাড প্রেসার ভাল হয় না জেনে কন্ট্রোল না করলে পরের দিনই স্ট্রোক করে মারা যেতে পারেন। তাই খুশকি ভাল হয় না জেনে এটাকে নিয়ন্ত্রণে না রাখলে সব চুল পড়ে যাবে কয়েক বছরেই। তখন আর মামলা করে লাভ নেই। এন্টি ডেনড্রাফ শ্যাম্পু, যেমন-পলিটার, সেলসান ব্লু এবং আরও অনেক শ্যাম্পু দিয়ে খুশকি কন্ট্রোল করা যায়। প্রয়ােজনে একজন চর্মরােগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

Previous Next
No Comments
Add Comment
comment url