যক্ষ্মা রোগের ব্যাখ্যা ও কিছু প্রশ্নের উত্তর
যক্ষ্মা হলে ভালমন্দ খাওয়ার দরকার নেই
অধ্যাপক (ডাঃ) সুজিত মিত্র
❏ প্রশ্ন: হাঁচি, কাশি এমনকি অসুস্থ মানুষ কথা বললে বা গান গাইলেও যক্ষ্মা রােগ ছড়িয়ে পড়ে?
☛ উত্তর: ফুসফুসে যক্ষ্মা থাকলে হাঁচি কাশি, কথা বলা বা গান গাওয়ার মাধ্যমে জীবাণু বাতাসে চলে আসে। সংক্রামিত করে ধারে কাছের মানুষকে।
❏ প্রশ্ন: তাহলে তাে খুব মুশকিল। বাসে, ট্রামে, রাস্তাঘাটে এত অসংখ্য মানুষের সঙ্গে ঘেঁসাঘেঁসি করে চলতে হয়?
☛ উত্তর: সংক্রামিত হলেই আপনি অসুস্থ হবেন ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। বাতাসে, খাবারে, জলে সর্বত্র লক্ষ লক্ষ জীবাণু ঘুরে বেড়ায়। সেরকম হলে তাে বেঁচে থাকারই কথা নয়।
❏ প্রশ্ন: অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তত কে?
☛ উত্তর: প্রতিরােধশক্তি জোরদার হলে অনেক সংক্রমণই এড়িয়ে যেতে পারে শরীর।
❏ প্রশ্ন: প্রতিরােধ শক্তি কীভাবে বাড়ানাে যায়?
☛ উত্তর: ভাল খাওয়া দাওয়া, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন এবং বিশেষ করে যক্ষ্মার বেলায় ছােটবেলায় যদি বিসিজি ভ্যাকসিন নেওয়া থাকে বােগ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
❏ প্রশ্ন: বি সি জি ভ্যাকসিন নেওয়া থাকা সত্ত্বেও তাে যক্ষ্মা হয়?
☛ উত্তর: যক্ষ্মা দুধরনের প্রাইমারি বা প্রাথমিক এবং পােস্ট প্রাইমারি বা প্রাথমিক পরবর্তী। প্রাথমিক যক্ষ্মায় জীবাণু শরীরে ঢােকার পর প্রতিবােদ শক্তি তাকে আটকাতে না পারলে যক্ষ্মা মারাত্মক ভাবে দেখা দেয়। প্রাথমিক যক্ষ্মা সেরে গেলে পরবর্তী কালে যদি আবার যক্ষ্মা হয় তাকে বলা হয় প্রাথমিক পরবর্তী যক্ষ্মা। এবং তার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। প্রাথমিক যক্ষ্মা ফুসফুস ছড়াও শরীরের প্রায় প্রতিটি প্রত্যঙ্গে যেমন গলা, পেট, হাড় ইত্যাদিতে যক্ষ্মার বীজ ছড়িয়ে দেয়। প্রতিরােধ সক্রিয় হলে তখন তখন তার রূপ প্রকাশ পায় না। কিন্তু কোনও কারণে সেই অংশের প্রতিরােধ শক্তি কখনও কমে গেলে সেই প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে। প্রাথমিক পরবর্তী যক্ষ্মার লক্ষ্য কিন্তু ফুসফুস। বিসিজি ভ্যাকসিন প্রাথমিক যক্ষ্মার বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরােধ তৈরি করে। অতএব বিসিজি ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে যক্ষ্মা হলেও তা হবে প্রাথমিক পরবর্তী যক্ষ্মা, যা ফুসফুস ছাড়া অন্য কোনও প্রত্যঙ্গে হবে না এবং মারাত্মক রূপ নেবে না। ঠিকঠাক ওষুধ পত্র খেলে এ নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।
❏ প্রশ্ন: কিন্তু ঠিকঠাক ওষুধপত্র খেলেও সারে না এমন যক্ষ্মাও তত আছে?
☛ উত্তর: হ্যা, প্রচলিত প্রায় কোনও ওষুধেই সাড়া দেয়না এমন যক্ষ্মা, যাকে বলে প্রতিরােধী যক্ষ্মা বা মাল্টি ড্রাগ রেজিসট্যান্ট টিউবার কুলােসিস বা সংক্ষেপে এম ডি আর টি বি, সত্যিই ভয়াবহ। এই যক্ষ্মা হয় মূলত সঠিকভাবে ওষুধপত্র না খাওয়ার দরুণ। কোনও একটা ওষুধ হয়ত কেউ কিছুদিন খেলেন, কিন্তু যে মুহূর্তে রােগের উপসর্গ চলে গেল ওষুধ বন্ধ করে দিলেন। রােগ সারেনি। কাজেই আবার অসুস্থ হওয়ার ব্যাপার থাকবে। তখন কিন্তু শরীরে থেকে যাওয়া যক্ষ্মার জীবাণু এই ওষুধটির বিরুদ্ধে প্রতিরােধ শক্তি গড়ে তুলেছে। ফলে নতুন করে চিকিৎসা শুরু হওয়ার কিছু দিন পর যখন দেখা যাবে এই ওষুধ কাজ করছেনা ততদিনে রােগ এগিয়ে গেছে অনেকখানি। সামলাতে নতুন ওষুধ দিতে হবে। এভাবে দু'এক বার চললেই প্রচলিত ওষুধগুলিব বিরুদ্ধে প্রতিরােধ তৈরি হয়ে যায় শরীরে। যেহেতু যক্ষ্মা রােগটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়, এই মানুষটির দ্বারা যারা যাবা সংক্রামিত হবেন সবার মধ্যেই একই সমস্যা দেখা দেবে। এদের রােগ ছড়ানােব ক্ষমতাও বেশি কারণ দীর্ঘদিন কোনও চিকিৎসাই প্রায় এদের করা যায় না।
❏ প্রশ্ন: তাহলে এদের পরিণতি কী? মৃত্যু?
☛ উত্তর: আমাদের দেশে এর প্রকোপ বাড়ছে। এবং পরিণতি প্রায়সময় মৃত্যুই।
❏ প্রশ্ন: কোন ওষুধ এদের শরীরে কাজ করবে তা কি খুঁজেই পাওয়া যায় না?
☛ উত্তর: কফ কালচার করে সেনসিটিভিটি পরীক্ষা করালে কোন ওষুধে এম ভি সার টিবি সারবে সেটা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেনসিটিভিটি পরীক্ষার সেরকম কোনও সুযােগ নেই। যাঁদের পয়সা আছে তারা বাইরে থেকে করিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু গরিবদের ক্ষেত্রে মুশকিল। আবার গরিবদের মধ্যেই এই রােগের প্রকোপ বেশি। কখনও সঠিক ওষুধপত্র না খেয়ে বােগ পুশে রাখার দরুণ। কখনও ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাসের দরুণ একের থেকে অন্যের সংক্রমণের ফলে।
❏ প্রশ্ন: সাধারণ যক্ষ্মার ক্ষেত্রে কতদিন চিকিৎসা চললে আর রােগ ছড়ায় না?
☛ উত্তর: মােটামুটি ভাবে ৪ সপ্তাহ। ওষুধ শুরু হওয়ার মােটামুটি সপ্তাহ চারেক পরে কফ পরীক্ষায় জীবাণুর হদিশ না পেলে রােগীকে সবার সঙ্গে মেলামেশা করার অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ অন্তত মাসখানেক রােগীকে আলাদা ভাবে থাকতে হয়।
❏ প্রশ্ন: ভাল খাওয়া দাওয়াবও তাে দরকার আছে?
☛ উত্তর: খাওয়া দাওয়া নিয়ে মানুষের মনে এখনও প্রচুর ভুল ধারণা আছে। যক্ষ্মা হওয়া মানেই ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, দামি ফল খেতে হবে এমন কোনও মানে নেই। সাধারণ গরিব মানুষ, যাঁরা শাক সবজি, ডাল, ভাত বা সস্তার চুনাে মাছ, ল্যাটা মাছ গেড়ি গুগলিতে অভ্যস্থ, তাঁরা যদি দু'বেলা তাই পেট পুরে খান এবং নিয়মিত ওষুধ খান দ্রুত রােগ সেরে যাবে। অনেকে আছে টাকায় কুলােচ্ছে না বলে দু চারটে ওষুধ বাদ দিয়ে ডিম, দুধ, ছানা খাচ্ছেন। কিন্তু খেয়াল রাখা দরকার যক্ষ্মা রােগের মূল দাওয়াই হচ্ছে ওষুধ। সঙ্গে সহজ পাচ্য খাবার পেট ভর্তি করে খেতে হবে। তবেই সুফল পাওয়া যাবে।
❏ প্রশ্ন: আর খােলামেলা জায়গায় থাকা?
☛ উত্তর: খােলামেলা জায়গায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকা এই রােগে খুব জরুরি। যতটা নিজের জন্য, তার থেকেও বেশি পারিপার্শ্বিকের জন্য। সুস্থ জীবন যাপন করলে রােগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমবে।
❏ প্রশ্ন: আগে যে যক্ষ্মা হলে পাহাড়ে বেড়াতে নিয়ে যেত?
☛ উত্তর: যক্ষ্মা রােগের চিকিৎসায় দুটি জিনিসই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। (১) যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রােগ নির্ণয় করা এবং (২) সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা।
❏ প্রশ্ন: রােগ নির্ণয় মানে তাে এক সরে এবং কফ পরীক্ষা?
☛ উত্তর: মূলত তাই। রােগীকে দেখে এবং কথাবার্তা বলে সন্দেহ হলে আমরা পরীক্ষা করি। এরপর পর পর তিদিন কফ পরীক্ষা করা হয়। বুকের এক্সরে সব সময় দরকার হয় না। ডায়াবেটিস আছে কিনা সেটাও দেখা হয়।
❏ প্রশ্ন: মান্টু টেস্ট?
☛ উত্তর: আমাদের দেশে, যেখানে অহরহ যক্ষ্মা রােগীর সঙ্গে ওঠাবসা, মাণ্ট টেস্টের সেরকম প্রাসঙ্গিকতা নেই। যদি এমনও হয় যক্ষা বলে মান্টু টেস্ট পজিটিভ সন্দেহও হচ্ছে, অথচ এক্সরে এবং কফ পরীক্ষায় সেরকম কিছু পাওয়া গেল না। চিকিৎসা শুরু করা যাবে না। তবে ৩ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই টেস্টের গুরুত্ব আছে।
❏ প্রশ্ন: যক্ষ্মা রােগীর সঙ্গে ওঠাবসা হলে শরীরে রােগ না থাকলেও মাণ্ট টেস্ট পজিটিভ হবে?
☛ উত্তর: শরীরে জীবাণু ঢুকলেই মান্টুটেস্ট পজিটিভ হবে, রােগ হােক না হােক্য
❏ প্রশ্ন: ডায়াবেটিস রােগীদের মধ্যে কি যক্ষ্মা হওয়ার প্রবণতা বেশি?
☛ উত্তর: হ্যা, ডায়াবেটিস হলে শরীরের রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা কমে যায়। আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এবং আক্রান্ত হলে সহজে সারতেও চায় না।
❏ প্রশ্ন: এডস হলে তাে আরও মারাত্মক অবস্থা?
☛ উত্তর: যক্ষ্মার প্রকোপ ইদানীংকালে এতখানি বেড়েছে খানিকটা এডসের কারণেও।
❏ প্রশ্ন: যক্ষা প্রতিরােধ করা যায় না? কিছু ওষুধ পত্র আছে শুনেছি যা খেলে যক্ষ্মা হয় না?
☛ উত্তর: মান্টুটেস্ট পজিটিভ হলে পশ্চিম দেশে আইসােনায়াজিড জাতীয় ওষুধ ৬ মাস থেকে ১ বছর খাওয়ানাের নিয়ম আছে আমাদের দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ এমনিতেই এমন বেশি যে এভাবে ওষুধপত্র দেওয়া হয় না।
❏ প্রশ্ন: প্লুরিসি কি যক্ষ্মার আগের ধাপ?
☛ উত্তর: পুরা অর্থাৎ ফুসফুসের বহিরাবরণে যদি যক্ষ্মার জীবাণু সংক্রমণ হয় তাকে বলে প্লুরিসি। আর ফুসফুসে সংক্রমণ হলে বলে ফুসফুসের যক্ষ্মা। বা প্রচলিত কথায় শুধু যক্ষ্মা। আসলে শতকরা ৯০ ভাগ যক্ষ্মাই হয় ফুসফুসে। সেজন্য যক্ষ্মা বলতে সাধারণত ফুসফুসের যক্ষ্মাকেই বােঝানাে হয়।
❏ প্রশ্ন: প্লুরিসির চিকিৎসাও কি যক্ষ্মার মতাে?
☛ উত্তর: ওষুধ পত্র, খাওয়া দাওয়া যক্ষ্মারই মতাে। প্লুরিসি সংক্রামক নয় তবে প্রাথমিক অবস্থায় বাচ্চাদের থেকে দূরে থাকতে বলা হয়। কিন্তু সে অর্থে আড়ালে থাকার দরকার পড়ে না।
❏ প্রশ্ন: কিন্তু অনেক সময় যে দেখা যায় প্রথমে প্লুরিসি হল তারপর তা যক্ষ্মায় দাঁড়িয়ে গেল?
☛ উত্তর: অনেক সময় একই সঙ্গে বা আগে পরে সংক্রমণ হতে পারে। তবে প্লুরিসির চিকিৎসা ঠিক ভাবে হলে যক্ষ্মা হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
❏ প্রশ্ন: শরীরের আর কোথায় কোথায় যক্ষ্মা সংক্রমণ হতে পারে?
☛ উত্তর: যে কোনও প্রত্যঙ্গে হতে পারে। শতকরা ১০ ভাগ সম্ভাবনা। তবে ছােটবেলায় বিসিজি টিকা নেওয়া থাকলে সাধারণত অন্য প্রত্যঙ্গে যক্ষ্মা হয় না।
❏ প্রশ্ন: কিন্তু বিসিজি টিকা নেওয়া থাকলেও তাে অনেক সময় পেটে বা গলায় যক্ষ্মা হয়?
☛ উত্তর: তার কারণ আলাদা। ফুসফুসের যক্ষ্মা খুব জটিল অবস্থায় থাকলে কফ মিশ্রিত থুতুর যতটুকু গলা বা পেটে যায় তা থেকেই ওই দুই জায়গা সংক্রামিত হয়ে যায়।
❏ প্রশ্ন: অনেকে বলেন ৩ সপ্তাহ বা তার বেশি যদি কাশি থাকে তাহলেই ডাক্তারের সঙ্গে যােগাযােগ করা উচিত?
☛ উত্তর: অবশ্যই। যক্ষ্মা হােক বা না হােক, ৩ সপ্তাহের ওপর কাশি চলতে থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার।
❏ প্রশ্ন: যক্ষার ক্ষেত্রেও তাে মূল উপসর্গ কাশি?
☛ উত্তর: একেক জনের ক্ষেত্রে একেকটা উপসর্গ বেশি জোরদার হয়। তবে সাধারণভাবে ৩ সপ্তাহের বেশি কাশি, অল্প অল্প জ্বর বিশেষ করে সন্ধের দিকে, বুকে ব্যথা, ওজন কমা, খিদে কমা ইত্যাদি উপসর্গ থাকে। রােগ বেশি দূর এগিয়ে গেলে কাশির সঙ্গে রক্ত আসতে পারে। তবে যক্ষ্মা হয়েছে নিশ্চিতভাবে বলতে গেলে কফ পরীক্ষা একান্ত জরুরি।