দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যা? জানুন আইবিএস রোগ সমন্ধে
সব সময় পেটের মধ্যে নানান সমস্যা লেগেই থাকে। কখনো ডায়রিয়া, গ্যাস, গড়-হজম আর কখনো অম্বল। বিভিন্ন ধরনের ঔষধ সেবনের ফলেও লিভারের সমস্যা দূর হচ্ছে না। মানসিক অশান্তি, টেনশন যতই বাড়ছে ফলে এই রোগের প্রকোপ যেন ততই বাড়ছে। আপনি যদি এই রকম পরিস্থিতিতে পড়ে থাকেন যা দীর্ঘদিন ধরে আপনার সঙ্গে চলছে। তাহলে বুঝবেন আপনি আইবিএস লিভার গন্ডগোলে ভুগছেন। এই আইবিএস সম্পর্কে এই পোস্টটিতে আমরা বিস্তারিত জানব। জানাচ্ছেন, ডাঃ সব্যসাচী পট্টনায়ক।
❍ প্রশ্ন: ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম কি মানসিক রােগ?
☛ উত্তর: ঠিক তা নয়। আসলে অবসাদগ্রস্ত বা অল্পেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন এমন মানুষের মধ্যে আই বি এস বেশি দেখা যায়। আবার খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নানা রকম চিন্তাভানায় জর্জরিত মানুষের অনেকেও এই রােগে ভােগেন বলে এরকম একটা ধারণার জন্ম হয়েছে।
❍ প্রশ্ন: কিন্তু আপনারাই তাে বলেন আই বি এসে পেট এবং মন দুইই যুক্ত থাকে।
☛ উত্তর: সে তাে নিশ্চয়ই। আই বি এস এমন একটা পেটের অসুখ যেখানে যুক্ত থাকে ব্রেন এবং গাট। কিন্তু এটা পেটের অসুখই। মানসিক রােগ নয়।
❍ প্রশ্ন: এর চিকিৎসায় যে অনেক সময় দুশ্চিন্তা কমাননার ওষুধ দেওয়া হয়?
☛ উত্তর: প্রতিটি অসুখেরই বাড়া কমার পেছনে কোনও না কোনও কারণ থাকে। দেখা গেছে অশান্তি, দুশ্চিন্তা বাড়লে আই বি এসের প্রকোপ বাড়ে। তাই, দুশ্চিন্তা কমানাের ওষুধ দেওয়া হয় অনেক সময়।
❍ প্রশ্ন: তার মানে অশান্তি - উদ্বেগ থেকে যে পেটের অসুখ হয় তাই আই বি এস? তাহলে পরীক্ষার সময় যে লাগাতার পেটের অসুখ চলে সেটাও আই বি এস?
☛ উত্তর: না, অশান্তি উদ্বেগ থেকে আই বি এস হয় সেটা ঠিক নয়। পরিসংখ্যান বলছে যাঁরা অশাস্তি উদ্বেগে ভােগেন তাঁদের আই বি এস বেশি হয়। দুটো কথা এক নয়। পরীক্ষার সময় যে ডায়েবিয়া হয় তাকে বলে নাভাস ডায়েরিয়া। পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে ডায়েরিয়া ঠিক হয়ে যায়। অথাৎ এটা সাময়িক সমস্যা। আই বি এস সারাজীবন জ্বালায়।
❍ প্রশ্ন: তার মানে আই বি এসের সমস্যা জীবনভর থাকবে?
☛ উত্তর: মােটামুটি কিছু না কিছু লেগেই থাকবে। একেক সময় একেকটা। কখনও ডায়েরিয়া। কিছুদিন হয়তাে ঠিক। আবার কনস্টিপেশন, আবার ডায়েরিয়া। আপনি বুঝে উঠতে পারবেন না যে কী এমন খেয়েছিলেন যে ডায়েরিয়া হল। অথবা নিয়ম মাফিক ইসবগুল খাওয়া সত্ত্বেও কেন কনস্টিপেশন হচ্ছে। কখনও দেখবেন বুক পেটের সংযােগস্থলে ব্যথা হচ্ছে। কখনও অম্বল। কোথাও কিছু নেই শুরু হল হজমের গণ্ডগােল, গ্যাস। অশান্তি উদ্বেগ বাড়ল তত সমস্যা বেড়ে গেল বহুগুণ। এরকমই পর্যায়ক্রমে ভাল থাকা মন্দ থাকা নিয়ে জীবন কাটবে।
❍ প্রশ্ন: ভাল থাকার কথা আর কোথায় বললেন?
☛ উত্তর: ভালও থাকবেন। ২-৩ মাস, ৬ মাস এমনকি ভাল থাকার সময়টা বক্স খানেকও হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে আপনি ঠিক ঠিক সাবধানতা মেনে চলছে কিনা তার ওপর।
❍ প্রশ্ন: কী কী সাবধানতা মেনে চললে ভাল থাকা যাবে?
☛ উত্তর: মানসিক চাপ, অশান্তি কম করতে হবে। দরকার হলে দুশ্চিন্তা কমানাের ওষুধপত্রও খেতে হতে পারে। নিয়মিত হাল্কা ব্যায়াম করতে হবে। আর খাওয়া দাওয়া হবে একেবারে নিয়মমাফিক এবং হালকা। রােজ দু'জি চামচ করে ইসবগুলের ভুষি খেতে হবে দুপুরে এবং রাত্রে। কিছু খাবার আছে যেগুলি আই বি এসের প্রকোপ বাড়ায় যেমন, চা, কফি, দুধ, আটা, ময়দা এবং কম ফাইবারযুক্ত খাবার। তবে কার কোনটা থেকে হবে বা আদৌ হবে কিনা সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
❍ প্রশ্ন: এই সমস্ত সাবধানতা মেনে চললে পেটের অসুখ কম হবে?
☛ উত্তর: তা নয়। তবে হলেও কমসম হবে। এছাড়া আরও একটা কথা আছে। আপনার আই বি এস আছে বলে অন্য কোনও পেটের অসুখ হবে না তা নয়। অনেকে এক টা সময় তিতিবিরক্ত হয়ে যা খুশি খেতে শুরু করেন। যেখান সেখানকার খাবার, জল। ফলে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্রােটোজোয়া ঘটিত পেটের অসুখেও আক্রান্ত হতে থাকেন।
❍ প্রশ্ন: অম্বল, গ্যাস, ডায়েরিয়া, কনস্টিপেশন সারাজীবন টেনে বেড়াতে হবে। এর কোনও চিকিৎসা নেই?
☛ উত্তর: শুধু এই সব উপসর্গই নয়, আরও কিছু থাকতে পারে। বারবার প্রস্রাবের বেগ, পিঠ কোমর ব্যথা, মাথা ব্যথা, মহিলাদের ঋতু চলাকালীন ব্যথা ইত্যাদি। আই বি এসের চিকিৎসা মূলত উপসর্গ ভিত্তিক। যেমন, ডায়েরিয়া হলে লােপারামাইড বা কোডেইন গ্রুপের ওষুধ খেতে হবে। পেট ব্যথায় মেবেভেরিন বা ডাই সাইক্রামিন জাতীয় ওষুধ, কনস্টিপেশনে ল্যাক্সেটিভ বা ইসবগুল। এর সঙ্গে দরকার মানসিক প্রস্তুতির। বারবার ঘুরে ফিরে সমস্যা দেখা দেবে, এটা মেনে নিতে পারা খুব জরুরি।
❍ প্রশ্ন: অল্প বয়সে না হয় মেনে নেওয়া গেল, বয়স বাড়লে কী হবে?
☛ উত্তর: কিছুই হবে না। আই বি এস জীবনের অঙ্গ হয়ে যাবে। আর সত্যি কথা বলতে কী আই বি এস বিরক্তিকর অসুখ। মারাত্মক তাে নয়।
❍ প্রশ্ন: আই বি এসের যে সমস্ত উপসর্গের কথা বললেন তা তাে কোলাইটিসেও হয়। কিন্তু কোলাইটিসের চিকিৎসা তাে আপনারা উপসর্গ ধরে করেন না।
☛ উত্তর: শুধু কোলাইটিস কেন আই বি এসের উপসর্গের সঙ্গে মিল আছে অনেক অসুখের। যেমন, আলসারেটিভ কোলাইটিস, ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ, অ্যামিবিক বা ব্যাসিলারি ডিসেক্সি, ডাইভার্টিকুলার ডিজিজ অফ কোলন, কোলন ক্যানসার, ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস, প্যানক্রিয়াস ক্যানসার, পেপটিক আলসার ইত্যাদি। কিন্তু সব ক্ষেত্রে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রােগের কারণ ধরা পড়ে। তাই উপসর্গ ধরে নয় কারণ ধরে চিকিৎসা হয়। কিন্তু আই বি এসে কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
❍ প্রশ্ন: তাহলে কী করে বােঝা যাবে রােগটা আই বি এস?
☛ উত্তর: নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা যেমন, এক্সরে, আলট্রাসনােগ্রাফি, রুটিন ব্লাড টেস্ট, আপার জি আই এণ্ডোস্কোপি, কোলনােস্কাপি ইত্যাদি করে কিছু পাওয়া না গেলে আই বি এসের সন্দেহ মনে আসে। আরও ব্যয়বহুল কিছু পরীক্ষা যেমন, সিটি স্ক্যান বা এম আর আই করেও যদি কিছু না পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে বলা যায় রােগটা আই বি এস।
❍ প্রশ্ন: এমনও তাে হতে পারে, কিছু খুঁজে না পেয়ে বলে দিলেন আই বি এস আছে। অথচ ছিল হয়তাে কোনও জটিল রােগ?
☛ উত্তর: সচরাচর তা হয় না। কারণ যে কোনও গ্যাস্ট্রোএনটেরােলজির আউটডােরে যত রােগী আসেন তার ৩০-৪০ শতাংশ আই বি এসে আক্রান্ত। এদের চেহারা ছবি, কথাবার্তা, উপসর্গ দেখে এবং কোনও পরীক্ষা নিরীক্ষাতেই কিছু না পাওয়া গেলে মােটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় রােগটা আই বি এস।
❍ প্রশ্ন: সারাজীবন ধরে যে এই রােগটা চলবে এতে শরীরের কোনও ক্ষয়ক্ষতি হবে না?
☛ উত্তর: রােগটা সারাজীন লাগাতার চলবে তা তাে নয়। মাঝে মধ্যে ঘুরে ফিরে আসবে। যথেষ্ট সাবধানতা নিলে অনেক দিনই ভাল থাকা যাবে। তবে সমস্যা যখন দেখা দেবে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা না হলে সাময়িক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তবে এর জন্য স্থায়ী ক্ষতি তেমন কিছু হয় না।
❍ প্রশ্ন: যে কোনও বয়সেই কি এই রােগ হতে পারে?
☛ উত্তর: যে কোনও বয়সে হতে পারে। তবে বেশি হয় ২০-৩০ বছরের মধ্যে। এবং আমাদের দেশে ছেলেদের রােগটি বেশি হয়। মেয়েদের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ। তবে আজকাল মেয়েদের মধ্যেও প্রকোপ বাড়ছে।
❍ প্রশ্ন: কেন?
☛ উত্তর: বােধহয় অশান্তি, উদ্বেগ বাড়ছে বলে।