মৃগী রোগে করণীয় চিকিৎসা ও কিছু প্রশ্নের উত্তর - Hysteria

মৃগী রােগী আচমকা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করবেন না 
—ডাঃ অনুপম দাশগুপ্ত

মৃগী থেকে নাকি আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে? অথচ আমরা তাে জানি মৃগী মানে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হাত পায়ে খিচুনি, মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরনাে ইত্যাদি। এর উত্তর হলো; বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃগীরােগে ওই সমস্ত উপসর্গ থাকে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা, মৃগী মানে শুধু ওইটুকুই। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। মানুষের আচরণগত দিকটি নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের যে অংশ, লিম্বিক এরিয়া, সেখানে ত্রুটি দেখা দিলে আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। কারাের ক্ষেত্রে হঠাৎ হঠাৎ কথা বন্ধ হয়ে যায়, কেউ হাত পা নড়াতে পারেন না, কেউ খানিকক্ষণের জন্য উ:ভ্রান্তের মতাে আচরণ করেন ইত্যাদি। 

❍ প্রশ্ন: মৃগী কি বংশগত? 

☛ উত্তর: কিছুটা। বাবা বা মা কারো যদি মৃগী থাকে ২-৪ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তান রােগাক্রান্ত হয়। দু'জনেরই থাকলে রােগ হওয়ার সম্ভাবনা ৮-১০ শতাংশ। 

❍ প্রশ্ন: এছাড়া আর কী কারণে মৃগী হতে পারে? 

☛ উত্তর: প্রায় সময়ই রােগের কারণ জানা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে মাথায় আঘাত, ম্যানিনজাইটিস, ব্রেন টিউমার, এনকেফেলাইটিস ইত্যাদি কারণে মৃগী দেখা দিতে পারে। 

❍ প্রশ্ন: মৃগী হওয়া মানে তাে সারা জীবন ওষুধ খেয়ে যাওয়া? 

☛ উত্তর: হ্যা, ওষুধপত্রের ব্যাপারে একটু কড়াকড়ি আছে। চিকিৎসা চলাকালীন একটানা ৩ বছর উপসর্গ দেখা না দিলে ই ই জি করানাে হয়। ই ই জি রিপাের্ট ঠিক থাকলে ওষুধের মাত্রা ধীরে ধীরে কমিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার মােটামুটি ৫-৬ বছর পরে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া যায়। 

❍ প্রশ্ন: ওষুধ বন্ধ হওয়ার পর আবার উপসর্গ দেখা দিতে পারে কি? 

☛ উত্তর: ওষুধ বন্ধ করতে হয় ধীরে ধীরে এবং ধাপে ধাপে। তারও আগে দেখা দরকার ই ই জি রিপাের্ট ঠিক আছে কিনা। কিছু ক্ষেত্রে ৩ বছর উপসর্গ বন্ধ থাকলেও রােগ থেকে যায় ভেতরে। সে ক্ষেত্রে ওষুধ বন্ধ করলে বা ঠিক ই ই জি রিপাের্টের ক্ষেত্রে আচমকা ওষুধ বন্ধ করলে এরকম হতে পারে। তখন খুব তারাতাড়ি নিউরোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযােগ করা দরকার। 

❍ প্রশ্ন: মৃগীরােগীর টি ভি দেখা কি বারণ? 

☛ উত্তর: না দেখাই ভাল। দেখলেও অন্তত ১০ ফুট দূরত্ব থেকে দেখতে হবে এবং একটানা আধ ঘন্টার বেশি দেখা যাবে না। আজকাল সব প্রােগ্রামের মধ্যেই বিজ্ঞাপন থাকে। অন্তত সেই সময়টুকু খােলা হাওয়ায়, ছাদে বা বারান্দায় ঘুরে আসতে পারলে ভাল হয়।

❍ প্রশ্ন: এরা তাহলে কম্পিউটার চালাতে পারবেন না? 

☛ উত্তর: কম্পিউটার চালাতে কোনও অসুবিধে নেই। ভিডিওগেম খেলা বা হলে গিয়ে সিনেমাও দেখা যেতে পারে। 

❍ প্রশ্ন: এদের তাে রাত্রিজাগা উচিত নয়? 

☛ উত্তর: না, রাত্রে ৬-৭ ঘণ্টা ঘুম এঁদের জন্য খুব জরুরি। 

❍ প্রশ্ন: এক আধ দিন অনিয়ম করলে কি কোনও অসুবিধে হতে পারে? 

☛ উত্তর: মৃগী থাকলে কিছু বিধি নিষেধ মেনে চলা দরকার। তবে ঠিকমতাে ওষুধপত্র খেলে এবং নিয়মকানুন মেনে চললে এক আধদিন অনিয়মে তেমন বিপদ কিছু হয়না।

❍ প্রশ্ন: নিয়ম কানুন বলতে?

☛ উত্তর: ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে এবং ওষুধের কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা ডাক্তারকে জানাতে হবে। প্রতি ৬ মাস অন্তর ডাক্তারের কাছে যাওয়া এবং রক্ত পরীক্ষা করানাে একান্ত জরুরি। ওষুধ চলাকালীন রাত্রে ৬-৮ ঘন্টা ঘুমােতে হবে। টিভি যথাসম্ভব কম দেখতে হবে। বেশি চিন্তা ভাবনা, উত্তেজনা এদের জন্য ভাল নয়। কাজেই ঝগড়া, মারামারি এড়িয়ে চলা দরকার। বারবার যাতে হজমের গণ্ডগােল না হয় সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। হালকা, সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই ভাল। হালকা ব্যায়াম, খােলা জায়গায় হাঁটাহাটি, খেলাধুলা ইত্যাদি করা যেতে পারে। 

❍ প্রশ্ন: হজমের গণ্ডগােলের সঙ্গে মৃগীর কোনও সম্পর্ক আছে? 

☛ উত্তর: সরাসরি নেই। তবে হজমের গণ্ডগােল হলে অন্যান্য খাবারের মতাে ওষুধও পুরােপুরি হজম হয় না। ফলে ওষুধের মাত্রা বাড়াতে হয়। 

❍ প্রশ্ন: এদের কি সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানাে বারণ? 

☛ উত্তর: অসুস্থ অবস্থায় অবশ্যই বারণ। তবে বেশ কিছু দিন উপসর্গ না থাকলে বা রােগী ভাল হয়ে গেলে সাঁতার কাটা এবং সাইকেল চালানাে দুইই সম্ভব। 

❍ প্রশ্ন: আর বিয়ে করা? 

☛ উত্তর: চিকিৎসা চলাকালীন করা উচিত নয়। কারণ রাত্রে ৬-৭ ঘণ্টা ঘুম এদের জন্য খুব জরুরি। বিয়ের ঠিক পরপর যা মেনে চলা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। ফলে রােগের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। 

❍ প্রশ্ন: অনেক সময় তাে চিকিৎসা অনির্দিষ্টকালের জন্য চলে? 

☛ উত্তর: ওষুধপত্র নিয়মিত খেলে এবং সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে চললে অধিকাংশ সময় চিকিৎসা শুরু হওয়ার ৫-৬ বছরের মধ্যে অবস্থা আয়ত্বের মধ্যে চলে আসে। তখন বিয়ে করলে অসুবিধে নেই। অনেকসময় রােগ ধরা পড়ে বেশি বয়সে, ৫-৬ বছর অপেক্ষা করার মতাে সময় হাতে থাকে না, সেক্ষেত্রে বিয়ে হয়। তবে গর্ভধারণের ব্যাপারে এদের অত্যন্ত সতর্ক হয়ে থাকতে বলা হয়। 

❍ প্রশ্ন: চিকিৎসা চলাকালীন গর্ভধারণ নিষিদ্ধ? 

☛উত্তর: উচিত নয়। কারণ শতকরা ৮ ভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্ত ওষুধের প্রভাবে গর্ভস্থ ভ্রুণের ক্ষতি হতে পারে। অনেকে সেই ভয়ে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে বারবার তরকা হতে থাকে, যা মা এবং বাচ্চা দুইয়ের জন্যই ক্ষতিকর। 

❍ প্রশ্ন: মৃগীর ওষুধ থেকে গর্ভস্থ ভ্রুণের কী ক্ষতি হতে পারে? 

☛ উত্তর: কিছু জন্মগত ত্রুটি নিয়ে বাচ্চা জন্মাতে পারে। যেমন বাচ্চার মাড়ি, ঠোঁট বা তালু কাটা হতে পারে, হৃৎপিণ্ডে ফুটো বা অন্য ধরনের হার্টের অসুখ নিয়ে বাচ্চা জন্মাতে পারে ইত্যাদি। 

❍ প্রশ্ন: গর্ভস্থ ভ্রূণে কোনও ত্রুটি দেখা দিচ্ছে কিনা তা আগে থেকে বুঝতে পারা যায় না? 

☛ উত্তর: তা অবশ্য পারা যায়। অ্যামনিওসিন্টেসিস করা যেতে পারে। তবে এই পদ্ধতি আমাদের দেশে এখনও তত জনপ্রিয় হয়নি। 

❍ প্রশ্ন: মৃগী রােগীর মধ্যে অনেক সময় ঘুমঘুম ভাব, আলস্য ইত্যাদি বেশি থাকে। সেসব কি ওষুধের জন্য হয়? 

☛ উত্তর: ফেনােবারবিটোন জাতীয় ওষুধে সামান্য ঘুমঘুম ভাব দেখা দিতে পারে। দাম একটু কম বলে এর ব্যবহার বেশি। তবে ঘুমের সমস্যা হয় না এরকম দামী বিকল্প ওষুধও আছে। 

❍ প্রশ্ন: কিছু ওষুধে তাে আবার খিদেও বাড়ে? 

☛ উত্তর: সােডিয়াম ভ্যালগপ্রায়েট জাতীয় ওষুধে খিদে বাড়তে পারে। 

❍ প্রশ্ন: অ্যালার্জি? 

☛ উত্তর: কিছু ওষুধে হতে পারে। সেক্ষেত্রে ডাক্তারকে জানালে তিনি ওষুধ বদলে দেবেন। 

❍ প্রশ্ন: মৃগী থাকলে বাচ্চারা কি খুব বেশি জেদি, রাগী হয়? 

☛ উত্তর: না, এই ধারণা ঠিক নয়। এই রােগটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচুর ভুল ধারণা আছে বাচ্চাকে ঠিকভাবে বড় করে তােলার পথে যা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বাচ্চা জেদ, রাগ ইত্যাদি দেখানাের সুযােগ পায়। যেমন, অনেক বাবা মা মনে করেন তাঁদের কোনও ভুলের জন্য বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হয়তাে গর্ভাবস্থায় সঠিক নিয়ম পালন করা হয়নি বা ঝগড়াঝাটি, অশান্তির দরুণ বাচ্চার মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অথবা বাচ্চা জন্মের সময় কোনও ত্রুটি বিচ্যুতি হয়েছে। কেউ ভাবেন বাচ্চাকে বড় করার সঠিক নিয়ম তাঁরা জানেন না। তাই বাচ্চার অসুস্থতা। এর ফলে অনেক সময় প্রয়ােজনের অতিরিক্ত মনােযােগ দেওয়া হয় বাচ্চার প্রতি। এবং বাচ্চা বাবা মায়ের দুশ্চিন্তার সুযােগ গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। 

❍ প্রশ্ন: এদের মধ্যে মনােসংযােগের অভাব দেখা দেয়? 

☛ উত্তর: বারবার খিচুনি এবং অজ্ঞান হতে থাকলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্র শুধু মনােসংযােগের অভাব নয় হতাশা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দেওয়া সম্ভব। 

❍ প্রশ্ন: একে ঠেকানাে যায় না? 

☛ উত্তর: বারবার অজ্ঞান হওয়া ঠেকাতে পারলেই সমস্যা এড়ানাে যায়। অতএব নিয়মিত ওষুধপত্র খেতে হবে এবং নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। 

❍ প্রশ্ন: হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে গেলে সেই মুহূর্তে কী করতে হবে? 

☛ উত্তর: নিচে ক্রমানুসারে বলা হলো:
  1. মাথা একপাশে ফিরিয়ে দিতে হবে যাতে গাজলা শ্বাসনালিতে ঢুকে বিপত্তি বাধাতে না পারে। 
  2. ধাঁধানাে দাত থাকলে তা বার করে নিতে হবে। 
  3. জামা, প্যান্ট, টাই ঢিলে করে দিতে হবে। বিশেষ করে টাই এবং জামার গলার বােতাম খুলে নেওয়া দরকার। নয়তাে তরকার সময় শ্বাসকষ্ট হতে পারে। 
  4. আশপাশ থেকে ধারালাে জিনিস সরিয়ে নেওয়া দরকার। 
  5. হাত পা চেপে ধরার দরকার নেই। 
  6. দাঁত আটকে গেলে অনেকে মুখের মধ্যে চামচ দিয়ে খােলার চেষ্টা করেন। জোরাজুরি করলে দাঁত ভেঙ্গে যেতে পারে। অতএব, সেই চেষ্টা না করাই ভালো।  
  7. ফিট চলাকালীন ওষুধপত্র খাওয়ানাের চেষ্টা করা উচিত নয়। 
  8. ফিট বেশিক্ষণ ধরে চললে শিরা অথবা রেকটামের মাধ্যমে ওষুধ দিতে হতে পারে 
  9. ফিটের পর খানিকক্ষণের জন্য বাচ্চা ক্লান্ত অথবা খিটখিটে হয়ে যায়। সে সময় তাকে শান্ত করে রাখতে হবে। 
  10. ফিটের পর অনেক সময় মাথা ব্যথা হয়। ব্যথা অসহ্য হলে অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়াতে হবে। 
Previous Next
No Comments
Add Comment
comment url